নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন

234

image009২০১৫ সালের ঘটনা । শুকুরের বয়স ১৫ বছর। ৯ম শ্রেণির ছাত্র। ছুটির দিনে গ্রীস্মের দুপুরে আমগাছের ছায়ায় বাঁশের তৈরি মাচায় বসার জন্য এগিয়ে এল সে। মাচায় শুয়ে ছিল ১০ বছরের একটি শিশু। তার নাম অয়ন। অয়নকে উঠে বসতে বলল শুকুর। অয়ন উঠতে অস্বীকার করাতে তাকে জোর করে তুলে কানে চড় কষে দিল শুকুর। প্রচন্ড ব্যাথায় চিৎকার করতে লাগল অয়ন। খবর পেয়ে তার বাবা হাকিম মালিথা ছুটে এলেন প্রতিবাদ করতে। বাক বিতন্ডার শুরু হল। কেউ একজন খবর পাঠাল শুকুরের বাবার কাছে। শুকুরের বাবা লাবলু মন্ডল চিন্তা করলেন, হাকিম মালিথা নিশ্চয় তার ছেলেকে মারধর করছে।  লাঠি হাতে ছুটে এলেন তিনি। তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তির শুরু হল আর শেষ হল দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। ১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হল। উভয় পক্ষই থানায় মামলা করল। অত্যন্ত ব্যথা পেলাম হৃদয়ে। কোন কারণ ছাড়াই এতবড় কাণ্ড ঘটে গেল। ভাবতে শুরু করলাম কি করা যায় এ সমাজের জন্য। অবশেষে সুযোগ এল।

আমি উপজেলা নির্বাহি অফিসার হিসেবে পদায়িত হলাম পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া উপজেলায়। ২০১৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। উপজেলা শিক্ষা অফিসার জনাব সিদ্দিকুর রহমান অনুরোধ করলেন তার বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভায় উপস্থিত থাকতে। উপস্থিত হলাম। আমার সামনে প্রায় ৫০০ জন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপস্থিত রয়েছেন। আমাকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করা হলে image008আমার মনের কথাটি বলে ফেললাম। আমাদের এখন সব হয়েছে। অভাব গেছে। অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে কিন্তু নৈতিক উন্নয়ন হয়নি। বরং অবক্ষয় হচ্ছে দিন দিন। এজন্য কিছু করতে হলে আপনাদের নিয়েই শুরু করতে চাই। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলেন। বুঝলাম, সবাই প্রয়োজন অনুভব করছেন। এরপর সারাদিন অফিসে কাটাই। ভোর পাঁচটায় উঠি, পড়াশুনা করি- কিভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা বাস্তবায়ন করা যায়। অবশেষে একটি পদ্ধতি বের করি। শিশুদের আত্নসচেতন করতে হবে শিশু বয়স থেকেই। ভাল আর মন্দের পার্থক্য বোঝাতে হবে তাদের। ভাল কাজের অভ্যাস তৈরি করতে হবে এখন থেকেই। প্রত্যেক শ্রেণিকক্ষে সাতটি ভাল কাজ ও সাতটি মন্দ কাজের তালিকা পিভিসি পেপারে ছাপিয়ে দেওয়া হল। এছাড়া ভাল কাজের চিত্রও টাঙানো হল দেয়ালে। আর প্রত্যেক ছাত্রের হাতে তুলে দিলাম নৈতিক ডায়েরি যাতে অনেকগুলো ভাল কাজের তালিকা ছাপানো আছে। প্রতিদিন শিশুরা ভাল কাজ সম্পন্ন করে টিক চিহ্ন দেয় ডায়েরিতে। শিখন কৌশলের উপর প্রধান শিক্ষকদের প্রতি মাসে একদিন প্রশিক্ষণ এবং সুযোগ পেলেই মা সমাবেশে শিশু লালন কৌশলের উপর আলোচনা করি। পুরো প্রক্রিয়াকে সহজ ও টেকসই করার জন্য শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য কয়েকটি পুস্তক প্রকাশ করা হল এবং ভাঙ্গুড়া এথিকস ফাউন্ডেশন নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তৈরি করা হল। এভাবে যাত্রা শুরু। একবছরের মধ্যেই পরিবর্তন হয়ে গেল অনেকগুলো স্কুলের অবস্থা। শিশুরা এখন নৈতিক। তারা পথের ভিক্ষুককেও সালাম দেয়, সম্মান করে; জিগ্যেস করে কেমন আছেন তারা। সাধ্যমতো সাহায্য করে দুর্বলদের। সাধ্যমত সামাজিক দায়িত্ব পালন করে- পথের কাঁটা সরানো, গাছের যত্ন নেয়া, পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানিকে সাধ্যমত সেবা করা, পানির অপচয় রোধ করা ইত্যাদি। পাবনা জেলার ভাঙ্গুড়া উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এখনও চলে নৈতিক শিক্ষা কার্যক্রম।

২০১৭ সালের নভেম্বর মাস । প্র্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের মাধ্যমে ৫ দিনব্যাপী নাগরিক সেবায় উদ্ভাবন বিষয়ক প্রশিক্ষণের সুযোগ পেলাম। তারপর ২ দিনের প্রকল্প ডিজাইনের প্রশিক্ষণ। নৈতিক শিক্ষা বাস্তবায়নের এক চমৎকার সিঁড়ির সন্ধান পেলাম। এটুআই প্রকল্পের সার্বিক সহযোগিতায় নৈতিক শিক্ষার এ কার্যক্রম এখন ভাঙ্গুড়া অতিক্রম করে ফরিদপুর জেলার প্রাথমিক image003বিদ্যালয়ে ছাড়িয়ে পড়েছে। এ জেলার প্রতিটি উপজেলায় দুইটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষার মডেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া। নিজ অর্থায়নে কমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে শিশুদের মধ্যে নৈতিক ডায়েরি ও অভিভাবকদের মধ্যে শিশু লালন কৌশল নামক পুস্তকটি বিতরণ করেছেন তিনি। অন্যান্য বিদ্যালয়গুলোতে এনজিওসমূহ অবদান রেখেছে। কমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন নৈতিক শিক্ষার এক অন্যতম মডেল হিসেবে ভূমিকা রাখছে। এখানে দৈনিক সমাবেশের শুরুতে শিশুদের নৈতিকতার উপর উদ্বুদ্ধকরণ বক্তব্য প্রদান করা হয়। তাৎপর্য বোঝানো হয় জাতীয় সংগীতের ও শপথের। প্রতিদিন তারা নৈতিক ডায়েরিতে কৃত ভাল কাজের তালিকায় টিক চিহ্ন দেয়। এভাবে তাদের ভাল কাজের অভ্যাস তৈরি হচ্ছে, আর ভাল কাজের অভ্যাস তাদের জীবনে মূল্যবোধ এনে দিয়েছে। এজন্য কমলাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মূল্যবোধ আত্নশৃঙ্খলা, পরোপকারিতা, সহনশীলতা, বিনয় ও পরার্থপরতা। দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন হয়েছে শিক্ষকদের, শিশুদের, অভিভাবকদের ও সমাজের মানুষের। এখন খুশি বাবা-মা, খুশি শিক্ষকগণ, খুশি এলাকাবাসী।

মোঃ শামছুল আলম
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি)
ফরিদপুর।