রঙিন স্কুলে শিক্ষারং

67

মানিক আকবর, চুয়াডাঙ্গা ২১ মে, ২০১৮ ০০:০০

আর দশটি বিদ্যালয়ের মতোই বিদ্যালয় দুটির ভবনগুলো ছিল সাদামাটা। ছাত্র-ছাত্রী ছিল কম। সেই বিদ্যালয় দুটির ভেতরের-বাইরের চেহারা বদলে দিলেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওয়াশীমুল বারী। এতে বদলে গেল আরো অনেক কিছু। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসা ও লেখাপড়ার আগ্রহ এবং ভর্তির চাপ বেড়ে গেল। কমে গেল ঝরে পড়া ও অন্য বিদ্যালয়ে চলে যাওয়া। এমনকি মে মাসেও অনেকে আসছে বিদ্যালয় দুটিতে ভর্তির আবেদন নিয়ে।

বদলে যাওয়া বিদ্যালয় দুটি হলো চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের নেহালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের শংকরচন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

2313281_kalerkantho-2018-21-pic-5কী করেছিলেন ইউএনও : তিনি দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টে দেন। বিদ্যালয়ের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেন। অভিভাবকদের আগ্রহ বাড়ান। এ জন্য ইউনিয়নের এলজিএসপি-৩ (পিবিজি)-এর অর্থায়নে বিদ্যালয় দুটির ভবন-দেয়াল ভেতরে-বাইরে স্থায়ীভাবে নানা রঙে রঙিন করা হলো। শ্রেণিকক্ষে, দেয়ালে দেয়ালে আঁকা হলো মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য, কার্টুন, বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি ইত্যাদি। সীমানা দেয়ালে লেখা হলো শিক্ষণীয় কথা, বাণী। রংতুলির আঁচড় পড়ল বিদ্যালয়ের গেটেও। দুটি বিদ্যালয়ই সাজানো হলো লাল-সবুজ রংকে প্রাধান্য দিয়ে। দূর থেকে তাকালে বাংলাদেশের পতাকার কথা মনে পড়বে, বুকের ভেতর দেশের ছবি ভেসে উঠবে। যে কেউ সামনের পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বিদ্যালয়ের দিকে তাকালে চোখ আটকে যাবে—এমন করা হলো। গত ২২ মার্চ নেহালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৭ এপ্রিল শংকরচন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে রঙিন বিদ্যালয় হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন আহমেদ।

ছবি-লেখায় ষড়ঋতু : শংকরচন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানাপ্রাচীর পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখা গেল, পশ্চিম দিকের দেয়ালে বাংলাদেশের ষড়ঋতুর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। দেয়ালে লেখা গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল, শরৎকাল, হেমন্তকাল, শীতকাল ও বসন্তকাল। বর্ষাকাল লেখার সঙ্গে আছে বৃষ্টির ছবি। অন্য ঋতুগুলোও ছবি এঁকে বোঝানো হয়েছে। বোঝা গেল, বিদ্যালয়ে আসা শিক্ষার্থীদের ছয়টি ঋতুর নাম জিজ্ঞেস করলেই বলে দিতে পারবে। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসা এবং ছুটির পর বাড়ি ফেরার সময় দেয়ালের এসব লেখা পড়ে। প্রথম শ্রেণির কক্ষের একটি দেয়ালে অ, আ, ই থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত লেখা। শিশুরা বই না খুলেও দেয়ালে তাকিয়ে তাদের পড়া মুখস্থ করতে পারছে। অঙ্কের সূত্রও লেখা আছে দেয়ালে। শিশুদের কাছে মীনা কার্টুন ও মিকি মাউস বেশ জনপ্রিয়। দুটিই শিক্ষণীয় কার্টুন। দেয়ালের এসব কার্টুনও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।

নেহালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরের দেয়ালে মীনা কার্টুন, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, জাতীয় সংসদ ভবন, নদী-নৌকা, গরুর গাড়ি ইত্যাদি আঁকা হয়েছে। এক শিক্ষক বলেন, শিক্ষার্থীদের শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ বিষয়ে জানা দরকার। দেয়ালে তাকিয়েই তারা তা জানছে। বিদ্যালয়ে ঢোকার আগেই দেয়ালের ছবি তাদের পড়া মনে করিয়ে দেয়। সেই হিসেবে বিদ্যালয়টি শুধু দৃষ্টিনন্দন করতেই রাঙানো হয়নি। শিশুরা যেদিকে তাকাবে সেদিকেই শিক্ষণীয় কিছু পাবে। যা কিছু আছে, তা শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেবে, সুন্দর মনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। এসব বদলেই নিশ্চুপ থাকেননি ইউএনও ওয়াশীমুল বারী। শিক্ষার্থীদের জীবনধারা, সততা, শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা শেখাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিদ্যালয়ের মাঠে টেবিলে রাখা হয় ৩০০ প্যাকেট বিস্কুট ও পানির বোতল। এরপর শিক্ষার্থীদের সারিতে দাঁড়িয়ে একে একে টেবিল থেকে দুটি করে বিস্কুটের প্যাকেট ও একটি বোতল নিতে বলা হয়। লাইন ভাঙা, দুটির বেশি বিস্কুট নেওয়া, বিস্কুট খাওয়ার পর প্যাকেট যেখানে-সেখানো ফেলা আর খাওয়ার আগে হাত ধোয়া হয়েছে কি না, লক্ষ রাখা হয়।

দারুণ খুশি শিক্ষার্থীরা : শংকরচন্দ্র প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বৃষ্টি বলে, ‘বিদ্যালয় রঙিন হয়েছে। আমরা খুব খুশি। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে ইচ্ছা করে। গ্রামের সবাই আমাদের বিদ্যালয়ের খুব প্রশংসা করে।’ একই শ্রেণির শারমিন খাতুন বলে, ‘আগে বিদ্যালয় যখন রঙিন ছিল না, এত ভালো লাগত না। এখন আমি সবাইকে বলি, আমাদের স্কুলটা খুব সুন্দর, রঙিন।’ শংকরচন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে বিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে রঙিন করা হয়েছে। বিভিন্ন নকশা আঁকা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী যাতে ঝরে না পড়ে, লেখাপড়ায় তাদের মনোনিবেশ বাড়ে সে জন্য এ উদ্যোগ। বিদ্যালয় রঙিন করার এ পরিকল্পনা সুযোগ্য ইউএনওর।

ইউএনও মো. ওয়াশীমুল বারী বলেন, পরিবেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উপযোগী করে বিদ্যালয় দুটি সাজানো হয়েছে। আঁকা এবং লেখার ভেতর দিয়েও শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখবে। আগেই চিন্তা ছিল বিদ্যালয় রঙিন করলে ঝরে পড়া কমবে। তা কমেছে এবং ভর্তির চাপ বেড়েছে। বিদ্যালয় রঙিন করে সফলতা এসেছে। সদর উপজেলার আরো কয়েকটি বিদ্যালয় রঙিন করা হবে।