বিলিতি জিনিস এখনই চলবে না এদেশে

43

বিলেতে গিয়েছিলাম এনার্জি পলিসি পড়তে। কোর্সটা দস্তুরমতো উন্নত বিশ্বের পারস্পেক্টিভে ডিজাইন করা। উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে শুধু মাথাপিছু আয়ই বেশি না, জীবনযাত্রার মানও সবদিক থেকেই অনেক উন্নত এবং সুসংহত। দেশেগুলো ধীরে ধীরে গ্রিনহাউজ গ্যাস উদগীরণকারী বিদ্যুৎ এবং পরিবহন সিস্টেম থেকে নবায়নযোগ্য পরিবেশবান্ধব সিস্টেমের দিকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে অনেক দেশ বেশ এগিয়ে গেছে। একটা পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত সিস্টেম থেকে তারা নতুন এবং উন্নততর সিস্টেমের দিকে যাচ্ছে। এরা এটাকে বলে টেকসই রূপান্তর বা সাস্টেইনেবল ট্রাঞ্জিশন। আমি দেখলাম, আমাদের কোর্সটার সিংহভাগেই এই রূপান্তর পড়ানো হচ্ছে। কিভাবে ট্রাঞ্জিশন হয়, কিভাবে সেটা পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, এইসব।

উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এই বিষয়টা পুরাই আলাদা। আমাদের তো আগের সিস্টেমটাই অনুপস্থিত। দেশে এখনও বিপুলসংখ্যক মানুষ বিদ্যুতের মুখই দেখেনি, যেখানে এরা অস্বাভাবিকহারে বিপুল বিদ্যুৎ খরচ করে চলেছে নিরবধি। আমি যে রুমে ক্লাস করতাম সেটার সিলিঙেই প্রায় ৫০ টা বাতি জ্বলছে, যেখানে চারটা হলেই চলত; সারাটা ভবন যেন আলোকসজ্জায় সেজে আছে। গোটা কোর্সে উন্নয়নশীল দেশের এনার্জি পলিসি নিয়ে মোটে দুইটা সেশন হল, যার একটায় ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকায় সোলার হোম সিস্টেম স্থাপনে সাফল্যের কীর্তিগাঁথা। ইডকলের (Infrastructure Development Company Limited) পরিচালনায় প্রায় ৫০ লক্ষ পল্লীবাড়িতে ছোট সোলার প্যানেল আর ব্যাটারি লাগানো হয়েছে। এই প্রোগ্রামে প্রচুর সাবসিডি দেওয়া আছে, ফরেন সাহায্যও কম নয়। এই প্রোগ্রামকে টেকসই উন্নয়নে গ্র্যান্ড সাক্সেস ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং বলছে যেকোন উন্নয়নশীল দেশের জন্য রোল মডেল। আমি ভেবে দেখলাম, ধারণাটা ব্যাপকভাবে ত্রুটিগ্রস্ত। প্রথমতঃ টেকসই উন্নয়নের এই প্রোগ্রামটি নিজেই টেকসই নয়। যেসব এলাকায় এই সোলার হোম সিস্টেম দেওয়া হয়েছে, সেখানে ন্যাশনাল গ্রীডের বিদ্যুৎ সংযোগ গেলে তারা এই সিস্টেম আর ইউজ করবে না। এই হোম সিস্টেমগুলো থেকে খুব নগণ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়, যা দ্বারা টিভি, ফ্রিজ, এসি, ইস্তিরি চালান সম্ভব না। সম্ভব করতে গেলে বিপুলসংখ্যক সোলার প্যানেল আর ব্যাটারি লাগবে যা খুবই ব্যয়বহুল। কিন্তু আর্থিক উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ এসব ইউজ করতে চাইবে। জার্মানিতে যারা সোলার হোম সিস্টেম ইউজ করে তারা সারা বাসা সোলার করতে প্রায় দেড় দুই কোটি টাকা ব্যয় করে। প্যানেল বসানোর জন্য প্রচুর ফাঁকা জায়গা তাদের, বায়ুবিদ্যুৎও পর্যাপ্ত।

আমাদের সোলার দিয়ে আমরা গ্রামে দুইটা বাতি, একটা ছোট ডিসি ফ্যান চালাতে পারি বাঁ মোবাইল চার্জ দিতে পারি।  আর কৃষিপ্রধান এই দেশে আমাদের মাথাপিছু জমি খুবই কম, চাষের জমিতে সোলার প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ চাষ আমরা এখনও অ্যাফোর্ড করি না। যদিও গ্রামে আধুনিক বিদ্যুৎ শক্তি ইন্ট্রোডিউস করতে পারছি, এই সামান্য বিদ্যুৎই অনেক আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনছে তথাপি এই পরিবর্তন আমাদের জন্য টেকসই আমরা এত ব্যয়বহুল একটা বিদ্যুৎ সিস্টেম শুরুতেই ফুল ফ্লারিশড করতে পারব না। উন্নত দেশগুলো একটা সম্পূর্ণ ইস্ট্যাবলিশড সিস্টেম থেকে নতুন একটা সিসটেমে যাচ্ছে। আমাদের সেখানে সম্পূর্ণ নতুন একটা সিস্টেম সম্পূর্ণ শুরু থেকে ইন্ট্রোডিউস করতে হচ্ছে। এইটা বিরাট একটা পার্থক্য। এবং তাদের প্রায় সব পলিসি স্টাডিতেই এই বিষয়টার বিবেচনা অনুপস্থিত। এমনকি ডেভেলপমেন্ট স্টাডিতেও অনেকটা তাদের ধাঁচের উন্নয়ন পলিসি আমাদের গেলানোর চেষ্টা চালান হচ্ছে। যে প্রযুক্তি উৎপাদন তো দূরের কথা, ব্যবহারের সামর্থ্যই আমাদের নেই, তা অ্যাডপ্ট করতে বলা হচ্ছে। এর ফলে এক অস্বাভাবিকরকমের উন্নয়ন আমাদের ঘাড়ে চেপে বসেছে। এর একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল, আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা। কতরকমের ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের শিক্ষায় চালু হয়েছে, মানোন্নয়নের জন্য। কিন্তু গড়পড়তায় শিক্ষার মান শুধুই নামছে। আসলে আমাদের ট্রাঞ্জিশন এভাবে হবে না। আমাদের সবকিছুই আলাদা রকমের। ওসব দেশ আগে উন্নয়ন করেছে, তারপর মৌজমাস্তি করছে। আমরা উন্নয়নের আগেই নষ্ট হয়ে গেছি। ওরা টিভি, মুভি বানায় আর আমরা দেখি। ওরা পর্ন, টিভি সিরিজ তৈরি করছে, আর আমরা দেখছি আর সময় নষ্ট করে নষ্ট হচ্ছি কোন উন্নয়নের আগেই। ওরা সারা সপ্তাহ খাটুনি করে ছুটির দুইদিন মৌজ করে, আর আমরা জীবন জুড়ে কিভাবে মৌজ করব সেই চিন্তায় সারাটা জীবনই নষ্ট করে ফেলি। ওরা এতটাই ব্যস্ত যে ফেসবুকিং খুব কম করে। আমরা ফেসবুকেই পড়ে থাকছি সারাক্ষণ, সোশ্যাল মিডিয়াই হয়ে উঠছে আমাদের সোসাইটি। তাই ওদের পলিসি আমরা ইমপ্লিমেন্ট করলে স্রেফ গোল্লায় যাব। আমাদের পলিসি হতে হবে আমাদের চরিত্রের উপযুক্ত করে তৈরি।

ডেমোক্রেসি অ্যাডপট করার আগে জাতিকে তার জন্য প্রস্তুত করা দরকার। আমাদের গ্রীন এনার্জি দরকার কিন্তু আর্থিক সংগতি এবং ডিম্যান্ড আগে বিবেচনা করতে হবে। দূষণের সোশ্যাল কস্ট অনেক, কিন্তু সেটা ঠেকানোর সংগতি আমাদের এখুনি নেই। উননত দেশগুলো আমাদের চেয়ে লাখ লাখ গুণ বেশি কার্বন ছাড়ছে বাতাসে, বায়ুমণ্ডল একটা গ্লোবাল কমোডিটি, দূষণের ক্ষতি সবাইকে পোহাতে হচ্ছে, কিন্তু আমাদের পোহাতে হচ্ছে বেশি, এসব দূষণসৃষ্ট বিপর্যয় ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। ধরুন, গরম বেড়েই যাচ্ছে, ওরা এয়ার কন্ডিশন্ড রুমে ঢুকবে, গরমে চাষাবাদ করা যায় এমন ফসলের জাত আবিষ্কার করে ফেলবে। আমাদের দরিদ্ররা সেসব কিভাবে অ্যাফোর্ড করবে? এভাবে আমরা পিছিয়ে পড়তেই থাকব, আর তারা এগিয়ে যেতেই থাকবে। বিদেশে পড়ার একটা ভাল আউটকাম হতে পারে Way of Thinking এর উন্নয়ন; আমাদের চিন্তাভাবনা করার স্কিল বাড়িয়ে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যারা বিদেশের পলিসি এদেশে বাস্তবায়ন করতে চাইছেন আর নিজেদের ভাবছেন মহা পণ্ডিত, তাদের মত মূর্খ আমি আর কাউকে পাই না। যেসব প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলে প্রজেক্টর দেওয়া হল, সেসবের অনেক গ্রামে বিদ্যুৎ পর্যন্ত নেই, প্রজেক্টর ইউজে পারদর্শী শিক্ষক তো দূরের কথা। সব মেশিনগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেখানে এখনও ব্ল্যাকবোর্ডই কার্যকর পদ্ধতি। ঐসব গ্রাম থেকেই উঠে এসে উন্নতি করে অনেক বাঙালি অ্যামেরিকা লন্ডনে ভাল ভাল পজিশনে আছেন। কিন্তু এখনকার গ্রাম থেকে এমন ভরসা পাওয়া খুব বিরল। আমাদের দরকার আমাদের জন্য উপযুক্ত পলিসি, রুলস এবং রেগুলেশন্স। বিলিতি জিনিস এখনই চলবে না এদেশে। আগে আমাদের জাতীয়তাবোধ তাদের মত উন্নত হোক, তখন নেওয়া যাবে। আর সেই জাতীয়তাবোধ উন্নত করার জন্য নিজস্ব কার্যকর পলিসি উদ্ভাবন করতে হবে, মাথা খাটিয়ে, আশপাশ পর্যবেক্ষণ করে, আমাদের নিজদেরকে আয়নায় দেখে।

মোঃ তালুত, সিনিয়র সহকারী সচিব, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।