কখনো কি ভেবেছেন এই হলুদ টাইলস কেন?

217

Photographকাজী সায়েমুজ্জামান, ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এটুআই প্রোগ্রাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

ফুটপাতের যে ছবিটা দেখছেন, এটা ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলের পশ্চিম পাশের ফুটপাতের ছবি৷ অাজকে দুপুরে তুলেছি৷ অনেকে দেখেছেন ঢাকার ফুটপাতে টাইলস বসানো হয়েছে৷ এর একপাশে হলুদ টাইলস৷ কখনো কি ভেবেছেন এই হলুদ টাইলস কেন? হয়ত ভাবছেন সৌন্দর্যের জন্য৷ অাসলে তা নয়৷ এই ফুটপাত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বান্ধব৷ একটু খেয়াল করলে দেখবেন এই হলুদ টাইলসে সোজা স্ট্রাইপ অাছে৷ একটু উচু৷ একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সহজেই পা ফেলে সোজা বরাবর হেটে যেতে পারবে৷ অাবার ফুটপাত যেখানে ঢালু হয়েছে, সেখানে একটা টাইলসে ছয়টি গোলাকার বৃত্ত৷ পা ফেললে সহজেই বুঝা যায় এখানে ফুটপাত নেমে গেছে৷ চলার পথ করতে গিয়ে অামরা প্রতিবন্ধীদের কথা ভেবেছি৷ জানেন, প্রতিদিন যখন এই ফুটপাত দেখি গর্বে বুকটা ফুলে উঠে৷ ঢাকা সিটির অনেক বদনাম৷ তবে অামাদের ফুটপাত এখন প্রতিবন্ধীবান্ধব৷ ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে ধন্যবাদ৷ বলার প্রয়োজন নেই কার মাথা থেকে এমন অাইডিয়া অাসতে পারে৷ প্রয়াত মেয়র অানিসুল হকের মাথা থেকেই হয়ত এসেছে৷ দেখেছেন, একজন শিক্ষিত মার্জিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তি দায়িত্ব পেলে কি করতে পারে! এখন দেশের অন্য শহরের ফুটপাতগুলো হোfootক এমন প্রতিবন্ধীবান্ধব৷ জনপ্রতিনিধিদের কাছে এই প্রত্যাশা করবো৷ কারণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সারাদেশেই অাছেন৷

অবাক হয়ে যাবেন, দেশের মোট প্রতিবন্ধী মানুষের অন্তত ২০ শতাংশই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী৷ সেই হিসেবে দেশে কমপক্ষে ত্রিশ লাখ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রয়েছে৷ তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে এ সংখ্যা দেড় কোটির কম নয়৷ প্রতি বছর পাঁচ লাখের মতো মানুষ নিজের অজান্তেই অন্ধত্বের অসহায় শিকার হন৷ উন্নয়ন চান৷ কিন্তু এত সংখ্যক মানুষকে ভুলে গেলে উন্নয়ন হয়না৷ সবাইকে ভাবতে হবে৷ সবার সুবিধার কথা ভাবনাটাই উন্নয়ন৷

অামি অাইডিয়া নিয়ে কাজ করি৷ নতুন কোন অাইডিয়া দেখলে ছবি তুলি৷ সরকারি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীদের দেখাই৷ সিঙ্গাপুরের উদ্ভাবন দেখেছি৷ দেখেছি ভারতের উদ্ভাবনগুলো৷ অামি গ্রামে গঞ্জে যাই৷ মানুষের উদ্ভাবন দেখি৷ ছবি তুলি৷ কাজকে সহজ করতে এখন সবাই বুদ্ধি খাটায়৷ প্রযুক্তি লাগলে তারা সেটাও ব্যবহার করে৷ তবে সব ধরণের উদ্ভাবনে প্রযুক্তির ব্যবহার দরকার হয়না৷ অামি বিদেশের না দেশের সাধারণ মানুষের অারো কয়েকটা অাইডিয়া শেয়ার করবো৷

গত ২ ও ৩ মার্চ ঝিনাইদহে গিয়েছিলাম৷ দেখলাম অনেক জায়গায় মাটির কলসে পানি রাখা হচ্ছে৷ কিন্তু কলসগুলো একটু ভিন্ন৷ যেটা ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন৷ প্রতিটি মাটির কলসে লাগানো হয়েছে ট্যাপ৷ অার কলসটা একটু উপরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ ব্যস৷ অনেক সমস্যার সমাধান৷ মাটির কলস থেকে ঠান্ডা পানি ট্যাপ থেকে সহজেই গ্লাসে ঢেলে খেতে পারবেন৷ মাটির কলস থেকে পানি ঢেলে খেতে যে কত সমস্যা তা ভুক্তভোগী ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করে নেবেন৷ অামি নিজেও পানি খেতে গিয়ে মাটির কলস ভেঙ্গেছি অনেকবার৷ বিশেষ করে যখন পানি কলসের নিচের দিকে থাকে তখন কলস হাতে নিয়ে পানি ঢালতে হয়৷ কলস থেকে গ্লাসে পানি নেয়া কষ্টসাধ্য৷ প্রথমে জগে পানি ঢালতে হবে৷ তারপর জগ থেকে গ্লাসে৷ একগ্লাস পানি এত কষ্ট করে খুব পিপাসা না লাগলে কেউই খেতে চাইবেন না৷ এবার দেখলেন সহজ সমাধান৷ এই রকম কয়েকটা কলস একটা স্কুjarলের সামনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে৷ প্লাস্টিকের ফিল্টারের চেয়ে এটা অনেক ভালো৷ কারণ মাটির কলসে পানি ঠান্ডা থাকে৷ এবার অাপনারা যারা স্কুলের শিক্ষক রয়েছেন অামার ফেসবুকের ফ্রেন্ড লিস্টে, অাইডিয়াটা অাপনার স্কুলে প্রয়োগ করতে পারেন৷

অামি অাগেই বলেছি, এ লেখায় দেশীয় অাইডিয়া বলবো৷ এবার একটু ভিন্ন ধরণের অাইডিয়া শুনুন৷ হাসবেন না কিন্তু৷ অামরা গ্রামে যারা বড় হয়েছি, তারা কারো বাড়ি থেকে কিছু চুরি করে খাইনি এমন ফেরেশতা হাতে গোনা৷ যারা এমনটা করেন নি, জীবনে কিছু করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ৷ তাহলে কি কি চুরির তালিকায় ছিল৷ রস, ডাব, মুরগি৷ তালিকায় প্রথমে যার নাম থাকবে তাহলো- খেজুর রস৷ অামরা গ্রামের খবর রাখিনা৷ কয়েকদিন অাগে অামার বাবা ফোন করে বললেন, অামাদের বাড়ির সামনে স্কুলের ভবনে কিছু তরুন সারা রাত গান বাজিয়েছে৷ অার রাতে অামাদের গাছের ডাব সব সাবাড় করে দিয়েছে৷ অামি যেন থানার ওসিকে বলে দেই৷ অামার ছোট বেলার কথা মনে পড়লো৷ চুরিতো অামিও করেছি৷ দলবেধেঁ৷ বললাম, চুরি করে খেলে গাছের ফলন বাড়ে৷ কি অার বলবো৷ এজন্য তো থানা পুলিশ করা যায়না৷

যাই হোক, এক বাড়ির উঠানে কয়েকটা খেজুর গাছ৷ গাছ কাটা হলো৷ অনেক রস হয়৷ উঠোনের গাছের রস পুরোটাই চান মালিক৷ এটা দিয়ে পিঠা মিঠা খাবেন৷ কিন্তু সমস্যা ওই একটাই৷ সকালে কষ্ট করে গাছে উঠে রসের হাড়ি নামান৷ দেখেন রস নেই৷ অাগের দিন বিকালে একবার উঠে গাছ কেটেছেন৷ তারপর নেমেছেন৷ অাবার সকালে একবার উঠেছেন একবার নেমেছেন৷ মোট চারবার উঠানামা৷ অথচ সবই জলে৷ রাতের বেলা কে যেন নিয়ে গেছে রস৷ অনেক দিন রসসহ হাড়ি গায়েব৷ এবার এ সমস্যা সমাধানে নেমে গেলেন বাড়ির লোকজন৷ সারারাত রস পাহারা দেবেন! তা কি করে হয়৷ কস্ট ইফেক্টিভ হবেনা৷ রসের জন্য রাতজাগা সম্ভব নয়৷ তারা একটা চমৎকার অাইডিয়া বের করেছেন৷ সমাধানের ছবিটা এখানে দিতে পারলে ভালো হতো৷ কিন্তু তখন অামি ছবিটা তুলি নি৷ বাজার থেকে কিনে অানা হলো স্যালাইনের পাইপের মতো চিকন লম্বা পাইপ৷ একটা বিশেষ কায়দায় চুঙ্গি বানানো হলো৷ চুঙ্গির সাথে যুক্ত করা হলো পাইপের এক মাথা৷ অারেক মাথা ঘরের ভেতরে একটা পাত্রে৷ রস গাছ থেকে চুঙ্গি হয়ে পাইপ বেয়ে ঘরের ভেতরে রাখা পাত্রে গিয়ে জমা হচ্ছে৷ বুদ্ধি কি বাঙালির কম নাকি! ফলাফলটা দেখুন৷ চুরি বন্ধ৷ হাতের মুঠোয় রস৷ রাতে কেউ কাচা রস চেখে দেখতে চাইলেতো কথাই নেই৷ রসের হাড়ি কিনতে হলো না৷ হাড়ি ধুইতে হয়৷ তিন দিন পর পর৷ শুকাতে হয়৷ এ কষ্ট থেকে মুক্তি মিললো৷ মুক্তি মিলেছে সকালে রস নামানোর জন্য একবার গাছে উঠতে নামতে হতো- তা থেকে৷ সমস্যায় পড়লেই কেবল তা থেকে উত্তোরণের উপায় তৈরী হয়৷ একটু পরে বলছি সমস্যা কেন অাশির্বাদ৷ তার অাগে অারেকটা দেশীয় অাইডিয়া শুনিয়ে যাই৷

এক কৃষকের ধানক্ষেত শুকিয়ে গেছে৷ পানি দিতে হবে৷ তার ক্ষেতের পাশেই ছোট খাল৷ খালে দাড়িয়ে পানি সেচ করা সম্ভব নয়৷ তার কোন মটরও নেই৷ উপায় হচ্ছে ডোঙ্গা৷ তেলের টিনের মুখে ও নিচে বেত বা বাশ দিয়ে ঘুরিয়ে বাধাঁ হয়৷ তারপর চারপাশে অনেকগুলো শক্ত কাঠি দিয়ে উপরের বেতের সাথে নিচের বেতের সংযোগ করা হয়৷ ভেতরেও কাঠি দেয়া হয়৷ শক্ত করার জন্য৷ তৈরী হয়ে গেলো ডোঙ্গা৷ এবার দুই পাশে মোট অাটটা বা চারটা রশি বাধাঁ হয়৷ দুপাশে দুজন রশি ধরে একবার ডোঙ্গা পানিতে ফেলে ভরে অাবার তুলে উপরে উঠিয়ে পানি ফেলতে হয়৷ ডোঙ্গা রেডি৷ তার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পানি তুললেই চলবে৷
কিন্তু পরিবারে অার কোন জনবল নেই৷ একটা মজুরের মূল্য সাড়ে চারশ টাকা৷ খরচ পোষাবেনা৷ কৃষক একটা উপায় বের করে ফেলেন৷ অপর পাশে একটা বাঁশ পুতে দিলেন৷ তার সাথে দড়ি বেঁধে দিলেন৷ ব্যস৷ এবার অপর পাশে দাড়িয়ে তিনি পানি তুলতে লাগলেন৷ এতে ফল কি হয়েছে জানেন৷ পুরো একজন লোকের শ্রম সাশ্রয় হয়েছে৷ অাজকে অাইডিয়ার ব্যাপারে অার না৷

বলেছিলাম সমস্যার কথা৷ অামাদের দেশে এখনো মুখস্থ বিদ্যা অাছে৷ পরীক্ষা অাছে৷ বিএ পাস, এমএ পাস সবাইকে মুখস্থ করতে হয়৷ তা পরীক্ষার খাতায় বমি করতে হয়৷ তারপর? পরের উচ্চ শিক্ষা কি জানেন? সমস্যা খোঁজা৷ তার সমাধান বের করা৷ এটাই গবেষণা৷ অামাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো মুখস্থ বিদ্যায় পরীক্ষা হয়৷ অথচ বিদেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার ভিত্তিতেই উচ্চ শিক্ষা৷ এ কারণেই অামরা পিছিয়ে অাছি৷ উচ্চ শিক্ষা মানে সমস্যা খুঁজো৷ নির্ধারণ করো৷ তা নিয়ে রিসার্চের কাজ করো৷ সমাধান বের করো৷ বিদেশীরা নিজেদের দেশের সব সমস্যার সমাধান করে বিশাল বিশাল গবেষণা প্রকাশ করেছে৷ তাদের এখন সমস্যা খুজতেই গলদঘর্ম হতে হয়৷ সমস্যাই খুজে পান না৷ তাই গবেষণাগুলোও অাউট অব বক্স হয়৷ যেমন ধরুন, প্রত্যেক পুরুষ জীবনে কত টন লিপিস্টিক খায় তা এখন তাদের গবেষণার উপপাদ্য৷ এখন এদেশেও অাসেন তারা৷ এত সমস্যা দেখে তাদের চোখ চিকচিক করে অানন্দে৷ অার অামরা সমস্যা জানি৷ যদি বলা হয়, অাপনার অফিস থেকে এই সেবাটা দিতে পারছেন না কেন? গড়গড় করে সমস্যাগুলো বলে যাই৷ কখনোই দেখি না এগুলো সমাধান কিভাবে করতে হবে৷ অাইডিয়া দরকার ভাই৷ অামরা অাসলেই সৌভাগ্যবান যে অামাদের দেশে অনেক সমস্যা অাছে৷ সমস্যা না থাকলে গবেষণা হয়না৷ উদ্ভাবন হয়না৷ অাইডিয়া তৈরী হয়না৷

এবার অাপনার অাশপাশের সমস্যাকে একটু অন্যভাবে দেখুন৷ দেখবেন সমাধান অাপনার হাতেই৷