অধ্যক্ষ অনিমেষ ও সোশ্যাল মিডিয়া

63

ডাঃ অনিমেষ মজুমদারের ফেসবুক লাইফ বেশ কয়েক বছরের, কিন্তু অধ্যক্ষ অনিমেষ মজুমদারের মাত্র কয়েক মাস। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলা উচিৎ ছিল। কিন্তু চাকুরী জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও ভার কমাতে না পারা হেতু প্রাপ্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ের কথা ভিতরে লিখে শিরোনামকে অন্তত ভারমুক্ত রাখতে ইচ্ছে হলো।

রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের ভারপ্রাপ্ত হয়েছিলাম ৩১ অক্টোবর, ২০১৬তে। যোগদানের দিনই  ছাত্রীনিবাসে র‌্যাগিং এর অনভিপ্রেত ঘটনার কারণে সমস্যায় পড়ি। বহু চাপ ছিল তদন্ত রিপোর্ট আলোতে না আনার জন্য। সাহসের সাথে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করি। কিন্তু অধ্যক্ষ অনিমেষের দাপ্তরিক কাজে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার সাহসের সাথে শুরু হয়নি।

ভয়ে ভয়ে শুরু

চার মাসের মাথায় সোশ্যাল মিডিয়ার ভার টের পেলাম ‘পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপে। বিষয় ছিল – রংপুর মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে এমবিবিএসের মেয়েদের রুম বরাদ্দ দেয়া হলেও বিডিএসের মেয়েদের দেয়া হয় না এমন একটি পোষ্ট। এতে নীতি নির্ধারকদের কমেন্টের সূত্র ধরে আমি সম্পৃক্ত হই সে আলোচনায়। বিশেষ করে সচিব মহোদয় যখন জেনেভা থেকে প্রথমে এসএমএস ও পরে ফোন করলেন তখন খানিকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি তখনও এই গ্রুপের সদস্য ছিলাম না। পরের দিন সদস্য হয়ে ঐ পোস্টে প্রথম কমেন্ট করলাম। রমেক ডেন্টাল ইউনিটের প্রধান ডাঃ আশিক রায়হানকে দিয়েও কমেন্ট করালাম। সাথে কেউ থাকলে ভয় কমে এই ভরসায়।

image002তারপর কয়েকদিনের মধ্যে ভাইস প্রিন্সিপালের পরিত্যাক্ত কোয়ার্টারটি সংস্কার করে যখন ডেন্টাল ইউনিটের মেয়েদের সেখানে তুলে দিলাম তখন এই গ্রুপটির প্রতি ভয় দূর হয়ে ভালবাসা তৈরী হলো। সচিব বা ডিজিকে পত্র প্রেরণ করা যায়, রাজধানীতে গিয়ে দেখা করা যায়, জরুরী প্রয়োজরে ফোনও করা যায় কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় দিনের মধ্যে কয়েকবার মত বিনিময় করা যায়, নির্দেশনা পাওয়া যায়, তা জানা ছিল না। দাপ্তরিক কাজে সোশ্যাল মিডিয়াকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের বিষয়টির সাথে সেই আমার প্রথম পরিচয়।

সোশ্যাল মিডিয়া সংলাপ

image003ফেসবুকের Public Service Innovation Bangladesh গ্রুপে স্বাস্থ্য বিভাগের আরো কয়েকটি পোস্ট বেশ আলোচিত হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক স্যার সংলাপ আয়োজনের পরামর্শ দিলেন। গত ২৩ মার্চ সেই সোশ্যাল মিডিয়া সংলাপে স্বাস্থ্য পরিচালক, পাবলিক হাসপাতালের পরিচালক, পাবলিক মেডিকেল কলেজের অ্যধক্ষ, সিভিল সার্জন এবং সিটিজেন জার্নালিস্টগণ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হন। মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হতে সচিব ও ডিজিকে পাশে নিয়ে সংলাপটি সঞ্চালনা করেন। বিটিভি ও ফেসবুক লাইভে সরাসরি সম্প্রচারিত হয় সংলাপটি। ফেসবুক লাইভে ৬৫,০০০+ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই সংলাপে যুক্ত হন এবং প্রশ্ন ও মন্তব্য করেন।

অংশগ্রহণকারী সকলেই একটু শংকিত ছিলেন শুরুতে। না জানি কোন জবাবাদিহিতার মধ্যে পড়তে হয়। কিন্তু গুমোট পরিবেশটি এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক নিমেষেই দূর করে দিলেন এই বলে যে, ‘আমরা আজ জানবো কোথায় কোন ভাল কাজগুলো হয়েছে, ভাল কাজ দিয়ে আমরা মন্দকে দূরিভূত করবো’। আর সচিব মহোদয় বিশেষভাবে আমাকে রমেক ডেন্টাল ইউনিটের সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য ধন্যবাদ দিলেন। এমন ধন্যবাদ চাকুরী জীবনে এই প্রথম।

ডেন্টাল ইউনিটের ছাত্রীদের আবাসন সমস্যা সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসা এবং সেই পোস্টে নীতি নির্ধারকদের নির্দেশনা মন্তব্য এবং প্রশংসা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। সেই ধারাবাহিকতায় আমি ডেন্টাল ইউনিটের আরো দু’টো সমস্যার দিকে দৃষ্টি দেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতিবাচক পোস্ট আসার আগেই যদি সমস্যার সমাধান করে ফেলা যায় সেটাই তো ভাল। জানি একে সচেতনতা বলতে চাইলেও সমালোচকের দৃষ্টিতে এর নামকরণ করা হবে ‘ভয়’। তো সেই ভয়ে ডেন্টাল ইউনিটের শ্রেণীকক্ষ সংকটের সাময়িক সমাধান ও সপ্তাহে একদিন ওটি বরাদ্দের ব্যবস্থা করি।

ডেন্টাল ইউনিটের ওটি বরাদ্দ

image004প্রথমবারের মতো ডেন্টাল বিভাগকে নিয়মিতভাবে অপারেশন করার জন্য সপ্তাহে একদিন (শনিবার) নির্দিষ্ট  করে দিতে পারলাম এই হাসপাতালে ওটি কমপ্লেক্সে। জনগন এতে সরাসরি উপকৃত হবেন। আশা করি রংপুর মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটের ছাত্র ছাত্রীরা ব্যবহারিক শিক্ষা লাভ করবে আরো বেশী করে। এ বিষয়ে ফেসবুকে ইতিবাচক আলোচনা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।

ডেন্টাল ইউনিটের শ্রেণীকক্ষ সংকট

রমেক ডেন্টাল ইউনিটের ক্লাস রুম পরিদর্শন করতে গেলে শিক্ষার্থীরা তাদের শ্রেনীকক্ষের তীব্র সংকটের কথা জানায়। তাৎক্ষণিকভাবে ফার্মাকোলজি বিভাগের একটি কক্ষ সাময়িকভাবে তাদের ক্লাস রুম হিসাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করি। এসি না থাকার কারনে ডেন্টাল বিভাগের নিজস্ব ওটি চালু করা যাচ্ছে না। ডেন্টাল ভবনটি পাঁচ তলা  পর্যন্ত ভার্টিক্যাল এক্সটেনশন হলে শ্রেনী কক্ষের সংকট সমাধান হবে। এবং ডেন্টাল ইউনিটের দশটি বিভাগ পুর্নাঙ্গভাবে চালু করা যাবে যার মাধ্যমে বিডিএস শিক্ষার্থীরা তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হয়ে জনগনকে পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় ভালোভাবে সেবা দিতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। এতে জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

ডিজিএইচএস মহাপরিচালক মহোদয়ের ফেসবুকে মন্তব্য আমাকে উৎসাহিত করে। তিনি লিখেছেন – ‘‘অধ্যাপক অনিমেশ মজুমদারের প্রোএকটিভ ভূমিকাকে অন্যদের অনুকরণ করা উচিত বলে মনে করি। সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সাথে একাডেমিক বিষয়, সমস্যা ও সমাধান নিয়ে নিয়মিত মত বিনিময়ের প্রথা চালু করতে হবে। যে কোন সমস্যাই সমাধান করা যায়। ভবনের উর্ধমুখী সম্প্রসারণের স্বপ্নটিও পূরণ হবে। সকল চিকিৎসা শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানে পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু হোক’’।image005

ছাত্রীনিবাসের ফ্যান

রংপুর মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ মহোদয়ের বাসভবনকে সংস্কার করে বিডিএস ছাত্রীদের অস্হায়ী ছাত্রীনিবাস হিসাবে ব্যবস্হা করা হয়েছিল এবছরের ফেব্রুয়ারী মাসে। তখন শীতকাল ছিল তাই ফ্যানের অভাব বোঝা যায়নি। বর্তমানের তীব্র গরমে ফ্যান না থাকায় ওদের কষ্ট হচ্ছিল দেখে বারংবার গণপূর্ত বিভাগের ইএম শাখাকে তাগিদ দেই। শেষে বলি সত্বর ফ্যান না দিলে আমার রুমের ৬টি ফ্যান খুলে ওদের রুমে দিয়ে দিবো আর ফেসবুকে পোস্ট করবো। ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে ফ্যান খুলেও ফেলি। কিন্তু সেগুলো লাগানোর আগেই ফ্যানের ব্যবস্থা হয়ে যায়। বুঝলাম সরকারী দপ্তরগুলো এখন ফেসবুককে আমলে নিয়ে কাজ করে।

বিডিএস ছাত্রীদের ছাত্রীনিবাসে সিট বরাদ্দ

গত ২৭ মে, ২০১৭ তারিখে রংপুর মেডিকেল কলেজে প্রথমবাবের মত বিডিএস ছাত্রীদের শহীদ মাহবুব হোসেন ছাত্রীনিবাসের রুমে সিট বরাদ্দ করা হলো। বিডিএস ৪র্থ (৩য় ব্যাচ) ও ৩য় (৪র্থ ব্যাচ) বর্ষের ছাত্রীদের বরাদ্দ দেয়া হলো। ৩০ জানুয়ারী যে পোস্টের মাধ্যমে ফেসবুকে আমার প্রবেশ সেখানে ওয়াদা করেছিলাম আগামীতে বিডিএসের মেয়েদের জন্য সিট বরাদ্দ দেব। চার মাসের মাথায় সেই ওয়াদা পূরণ করতে পারার তৃপ্তি নিয়ে আশা করছি বিডিএসের ছাত্রীরাও সমান সুযোগ সুবিধা পেয়ে নিশ্চয়ই উৎসাহিত হবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মোটিভেশন

রংপুর মেডিকেল কলেজের ‘পঞ্চম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীরা সকালের ক্লাস করছে না। কারণ তাদের নির্ধারিত লেকচার গ্যালারীতে এসি নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কথা হলো এই না করা ক্লাসগুলো ওরা জীবনে আর পাবে না। আমাদের সময় কোনো ক্লাসে এসি ছিলো না। আমি নিজেও স্ট্যান্ড ফ্যান দিয়ে অফিস করছি। গরমে কষ্ট হবে তবু কাজ করে যেতে হবে, ক্লাশ করতে হবে – এই প্রত্যাশার কথা জানিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেই। ঐ পোস্টে রমেক এর অনেক প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী মন্তব্য করেন যারা এখন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। সবমিলিয়ে ক্লাস না করতে চাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের উপর একটি সামাজিক চাপ সৃষ্টি হয়। পরেরদিন প্রায় অর্ধেক ছাত্র-ছাত্রী ক্লাস করতে আসে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ এখন যথেষ্টই প্রচলিত। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে ছাত্র-ছাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ বা মোটিভেশন প্রদান বোধহয় এটিই প্রথম।

image006

শেষের কথা

সরকারী চাকুরী থেকে আমার অবসর গ্রহনের দিন আগামী ২৪ অক্টোবর, ২০১৭। নীতি নির্ধারকদের যদি মনে না হয় আমার চাকুরীকাল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন তাহলে আর মাত্র ৫ মাস। সীমিত সামর্থের মধ্যে আমি বাকী সময় যতটুকু সম্ভব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে যাবো। শুধু চাকুরীর দায়িত্ব মনে করে নয়, মানসিক তৃপ্তির জন্যই করে যাবো। আমার আর একটি স্বপ্ন হলো এই হাসপাতালে একটি কিডনী ওয়ার্ড চালু করা। এখানে ক্যাথ ল্যাব আছে, কিন্তু উপযুক্ত কার্ডিওলজিস্ট নেই। একজন কার্ডিওলজিস্ট চেয়ে উপরে লিখেছি। কার্ডিওলজিস্ট পেলে এনজিওগ্রাম এখানেই করা সম্ভব হবে। ছোট ছোট কার্ডিয়াক অপারেশনও করা করা যাবে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলের মানুষ স্বপ্ল মূল্যে, দ্রুত ও কম ভোগান্তিতে আরো বেশি স্বাস্থ্য সেবা নিতে পারবে।

সব শেষে সকল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও হাসপাতালের পরিচালকগণকে অনুরোধ করবো এই ‘পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন বাংলাদেশ’ ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হতে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সমস্যা ও সফলতা তুলে ধরতে। নীতি নির্ধারকদের সাথে ফলপ্রসু যোগাযোগ স্থাপনের এমন ভালো সুযোগ কমই আছে।

ডাঃ অনিমেষ মজুমদার, অধ্যক্ষ, রংপুর মেডিকেল কলেজ