সুশাসন সংহতকরণে সোশ্যাল মিডিয়া  

এনএম জিয়াউল আলম, সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ

170

সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে এবং ‘রূপকল্প ২০২১’-এ আগামী এক দশকে বাংলাদেশকে ক্ষুধা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০১২ সালে প্রণীত হয়েছে ‘জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ (National Integrity Strategy-NIS)। রাষ্ট্র ও সমাজে সুশাসন নিশ্চিতকরণের উদ্দ্যেশ্যে এ কৌশলপত্রে ১০টি রাষ্ট্রীয় ও ৬টি অরাষ্ট্রীয়  প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা হয়েছে । চিহ্নিত এ প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিতকরণ; শুদ্ধাচার নিশ্চিতকরণে প্রতিষ্ঠানসমূহের লক্ষ্য নির্ধারণ; লক্ষ্য অর্জনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশ সন্নিবেশকরণ; এবং সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে।

জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলে চিহ্নিত ১০টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্যতম প্রতিষ্ঠান হল নির্বাহী বিভাগ ও জনপ্রশাসন যেখানে  সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্তি ও জনগণের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি । তাই NIS- এ নির্বাহী বিভাগ ও জনপ্রশাসনের শুদ্ধাচারের উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে ‘জনগণের চাহিদা ও দাবির প্রতি দ্রুত সাড়া দানে সক্ষম এবং জনগণ ও সংসদের নিকট দায়বদ্ধ স্বচ্ছ নির্বাহী বিভাগ প্রতিষ্ঠা’ করার লক্ষ্যে জনপ্রশাসনের জন্য শুদ্ধাচার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকার ইতোমধ্যে অনেকগুলি সুশাসন সংহতকরণ-সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কয়েকটি হল- প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের জন্য সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি (Citizen’s Charter) প্রণয়ন, পৃথিবীর বৃহত্তম জাতীয় তথ্য বাতায়ন সৃষ্টি, সরকারি ফরমসসমূহের জন্য পৃথক পোর্টাল, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (GRS) চালুকরণ, তথ্য অধিকার আইন (RTI) বাস্তবায়ন, ওপেন গভর্মেন্ট ডাটা বিষয়ক কার্যক্রম, সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (APA under GPMS) চালুকরণ ; ই-নথি, ই-মোবাইল কোর্ট ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাশরুম ব্যবস্থা প্রণয়ন ; গণশুণানী (Public Hearing) আয়োজন, উদ্ভাবন (Innovation) এবং সেবা পদ্ধতি সহজীকরণ (SPS) চর্চা চালুকরণসহ সেবা প্রোফাইল প্রণয়ন, ভাল কাজের জন্য প্রনোদনা (Incentives), Civil Registration and Vital Statistics (CRVS) ব্যবস্থা চালুকরণ, একটি জীবনচক্রভিত্তিক জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা বেস্টনী কৌশল (NSSS) প্রণয়ন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Social Media) ব্যবহার এবং আরও বেশ কিছু। বর্তমানে জনপ্রশাসনে এগুলির চর্চা শুরু হয়েছে।

এসকল কার্যক্রমের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুক ব্যবহার করে সুশাসন সংহতকরণের চর্চা বিশেষভাবে লক্ষনীয়। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে এক বছর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মহোদয়ের ‘সবার জন্য উদ্ভাবন’ পোষ্ট দেওয়া এবং প্রাক্তন মুখ্য সচিব ও বর্তমান এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়কারী মহোদয়সহ বর্তমান মুখ্য সচিব মহোদয়ের ‘পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশান বাংলাদেশ’ (Public Service Innovation Bangladesh) ফেসবুক পেজে দিকনির্দেশনা প্রদানের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য । কারণ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে  উক্ত অংশগ্রহণের পর থেকে জনপ্রশাসনে এ মাধ্যমটি ব্যবহারের গুরুত্ব অধিকতর বৃদ্ধি পেয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের চাহিদা ও দাবির প্রতি দ্রুত সাড়া দানে সক্ষম জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সোশ্যাল মিডিয়া ইতোমধ্যে বেশকিছু দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে। এর কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন-

১। ডিসেম্বর ২০১৫-তে ফেসবুকের ‘পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন বাংলাদেশ’ গ্রুপে মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, জেলা পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে দুইদিনের ‘উদ্ভাবন বিষয়ক প্রশিক্ষণ’ আলোচনা শুরু হয়। সে সময় এ আলোচনায় মন্ত্রিপরিষদ সচিব মহোদয়, মুখ্যসচিব মহোদয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মহোদয়ের অংশগ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে ঠিক পরের মাসেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি করে। পরবর্তীকালে এ নির্দেশনার ভিত্তিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক উদ্ভাবন বিষয়ক প্রশিক্ষণকে সংযোজন করে অভ্যন্তরীন (in house) প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল সংশোধন করা হয়। পাশাপাশি ফেসবুকে আলোচনার মাধ্যমে ২০১৬ সালে ৭০০০ কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করার পরিকল্পণা গ্রহণ করা হয়-যা নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই বাস্তবায়িত হয়েছে।

২। এ সময় ‘নাগরিক সেবায় উদ্ভাবন’-কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিষয়টি ফেসবুক আলোচনায় গুরূত্ব পায়। সুপারিশ আসে একে প্রাতিষ্ঠানিক করতে হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে তা সংযোজন করতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংগে ফেসবুকে আলোচনার মাধ্যমে অতি স্বল্প সময়ে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে তা সংযোজন করা হয়।

৩। ফেসবুক আলোচনাতেই এক সময় উঠে আসে যে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সোশ্যাল মিডিয়া গাইডলাইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা। এ বিষয়টিও ফেসবুকে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়িত হয়েছে।

৪। ফেসবুক-কে জনসাধারণের অভিযোগ প্রতিকারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম (tool) হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসন।  সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে জনদূর্ভোগ কমাতে  স্থানীয় প্রশাসনের  উদ্যোগে চালুকৃত এ পেজটি  অতি কম সময়ের মধ্যে  নানাবিধ সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে সমস্যা নিরসনে উল্ল্যেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। বর্তমানে দেশের সকল বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, সরকারের অধিদপ্তর/সংস্থাসমূহ এবং মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহে জনদূর্ভোগ লাঘবে ফেসবুক ব্যবহারের চর্চা শুরু হয়েছে।

৫। সোশ্যাল মিডিয়ায় জনদূর্ভোগ তুলে ধরার জন্য স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত হয়েছে নাগরিক সাংবাদিক (Citizen Journalist), যারা জনদূর্ভোগ যথা সময়ে প্রশাসনের নজরে এনে তা লাঘবে  কার্যকর ভূমিকা রেখে চলেছেন।

৬। বরিশালের জেল খাল জনকল্যাণমূলক কাজে কম সময়ে বিপুল সংখ্যক জনগনকে একীভূত করার একটি বড় উদাহরন। এখানেও মূল ভূমিকায়  রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া । রংপুরের শ্যমাসুন্দরী খাল, টাংগাইলের লৌহজং নদীকে পূনর্জীবন প্রদানের যে কাজ এখন চলছে-তাও উঠে এসেছে ফেসবুক আলোচনা থেকেই।

৭। ত্রিশালের উপজেলা প্রশাসন ফেসবুকে জনসচেতনতা সৃষ্টি করে লক্ষ লক্ষ বৃক্ষ-চারা রোপন করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র/ছাত্রীদের হাতে প্রতিটি গাছের জন্য হেলথকার্ড তুলে দিয়ে বৃক্ষ রোপনের নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। বৃক্ষ রোপনের নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে রংপুরের তারাগঞ্জে।

৮। সোশ্যাল মিডিয়ায় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে জামালপুরের জেলা প্রশাসন আয়োজন করেছেন ফেসবুক মেলার। বরিশালসহ কয়েকটি জেলাপ্রশাসন চালু করেছেন সোশ্যাল মিডিয়া টেলিভিশন ।  সরকারের গৃহীত নানাবিধ উন্নয়নমূলক কাজসহ স্থানীয় জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এখন পাওয়া যাচ্ছে ফেসবুক-টিভিতে প্রবেশ করে ।

৯। কুড়িগ্রামের, ফুলবাড়ী উপজেলার ‘আপনার সেবা বুঝে নিন’-শীর্ষক সেবা রেজিস্টারটি শুদ্ধাচার চর্চার  ক্ষেত্রে এ সময়ের একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত । ফেসবুক পেজে এটি বর্তমানে ব্যাপককভাবে আলোচিত হচ্ছে ।

উপরের দৃষ্টান্তগুলো থেকে দেখা যায়, গতানুগতিক পদ্ধতিতে যা সহজে করা সম্ভব হতো না, সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফরম ব্যবহার করে তা সহজে এবং অপেক্ষাকৃত অনেক কম সময়ে করা সম্ভব হয়েছে।  উপরে বর্ণিত উদাহরণসমূহের বাইরেও আরো বিভিন্ন কর্মকান্ড বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে ।  এ ধারা অব্যাহত থাকলে আরও অনেক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হবে যা জনগণের চাহিদা ও দাবির প্রতি দ্রুত সাড়া দানে সক্ষম নির্বাহী বিভাগ ও  জনপ্রশাসন গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।